বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময়

সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা আমাদের এই বাংলাদেশ। আমাদের এই দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। এদেশের ৮০ শতাংশ মানুষ কোন না কোন ভাবে কৃষির সাথে জড়িত। ধান, গম, ভুট্টা মানুষের প্রধান খাদ্য এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এগুলো ছাড়াও মসলা জাতীয় ফসল জাতীয় অর্থনীতিতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময়
মসলা জাতীয় ফসল গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আদা। আদা বিভিন্ন সবজি ও মাংসকে মুখরোচক করতে ব্যবহার করা হয়। আদা খুব সহজেই আপনার বাসা বাড়িতে অল্প পরিসরে বা বস্তায় চাষ করতে পারেন। তাই আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করতে চলেছি বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময়।
পেজ সূচিপত্রঃ বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময়

ভূমিকা

আদা বাংলাদেশের একটি অন্যতম মসলা জাতীয় ফসল। গরু, মুরগি, হাঁস ইত্যাদির মাংসের স্বাদ বাড়িয়ে তুলতে আদা অনেক কার্যকরী ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের প্রায় সব জেলায় আদা চাষ করা হয়। আদা চাষ একটি লাভজনক ব্যবসা হলেও অনেকেই জানেন না আদা চাষের উপযুক্ত সময়। আদা চাষের জন্য বিশাল জায়গার প্রয়োজন হয় না।
আপনি আপনার বসতবাড়ির ফাঁকা জায়গায় খুব সহজেই অল্প পরিসরে হাতে চাষ করতে পারেন। তাই আপনাদের সুবিধার্থে আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করতে করেছি বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময়, বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি, আদার রোগ বালাই দমন, আদা বীজ কোথায় পাবো, আধা বীজের দাম, আদার অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও আদার উপকারিতা ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময়

আদা বাংলাদেশের অন্যতম একটি অর্থকারী ফসল। প্রতিবছর ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে ২.৯৮   লক্ষ মেট্রিক টন আদা উৎপাদিত হয়। যা আমাদের দেশের চাহিদা তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৪.৮২ লক্ষ মেট্রিক টন এর চাহিদা রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের গবেষণাকরা উন্নত জাতের আদার জাত আবিষ্কার করেছেন।

যেমনঃ বারি আদা-১, বারি আদা-২, ও বারি আদা-৩ ইত্যাদি। যার ফলন হেক্টর প্রতি ৩০ থেকে ৪০ টন। বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময় হচ্ছে এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত অর্থাৎ বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্য মাস আদা চাষের উপযুক্ত সময়। এছাড়া কৃষিবিদগন বলেছেন, নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর আদা বিক্রির উপযুক্ত সময়।

বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি

বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময় জানার পাশাপাশি চলুন জেনে নেই বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি। আদা চাষের জন্য তেমন কোন বড় পরিসরে জায়গার প্রয়োজন হয় না। এটি আপনি আপনার বাসা বাড়ির আশেপাশে যেকোনো পরিত্যক্ত জায়গায় করতে পারেন। বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি তুলনামূলক সহজ একটি প্রক্রিয়া। এতে উৎপাদন খরচ অনেক কম হয়।

প্রতি বস্তায় ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বস্তা প্রতি প্রায় ১ থেকে ২ কেজি আদা উৎপাদন করা যায়। বস্তায় আদা চাষের আরো বড় একটা সুবিধা হচ্ছে যদি কখনো রোগ বালাই দেখা দেই তবে শুধুমাত্র সেই বস্তাটা সরিয়ে নিলেই হয়। বস্তায় আদা চাষে নিড়ানি সহ অন্যান্য তেমন পরিচর্যা প্রয়োজন হয় না।

মাটি ও আবহাওয়াঃ বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময় ও মাটি আদা চাষে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আদা চাষের জন্য দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি উপযুক্ত। তবে খেয়াল রাখতে হবে অথচ এর জায়গাটা যেন উঁচু হয়।
বস্তায় মিশ্রন তৈরীর পদ্ধতিঃ আদা চাষের জন্য ইউরিয়ার খালি বস্তা নিয়ে নিচের দেওয়া উপাদান গুলো ভালোভাবে মিশিয়ে ১০ থেকে ১৫ দিন পূর্বে একত্রে করে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। যাতে বাতাস প্রবেশ না করতে পারে। মিশ্রণটি তৈরি করার জন্য মাটি, গোবর, কম্পোস্ট, জিংক, ছাই, পি এস পি ও বোরন সব এক্ষেত্রে মিশিয়ে নিতে হবে।

আদা রোপনের সময়ঃ এপ্রিল থেকে মে মাস আদা চাষের উপযুক্ত সময়।

­বস্তায় মিশ্রন ভরাট করাঃ আদা রোপনের পূর্বে বস্তাগুলো মাটির মিশ্রণ দিয়ে পূর্ণ করে দিতে হবে যাতে বস্তার উপরে ১ থেকে ২ ইঞ্চি ফাঁকা থাকে।

বস্তা সাজানো বা স্থাপন পদ্ধতিঃ ৩ মিটার চওড়া বিশিষ্ট দৈর্ঘ্যের বেড তৈরি করতে হবে। যেন একটি থেকে আরেকটি মাঝখানে ৬০ সেন্টিমিটার ড্রেন রাখা যায়। বেড টি অবশ্যই উঁচু করে রাখতে হবে, যাতে বেডে বৃষ্টির পানি না জমে। এরপর প্রতিটি বেডের মাঝে এমন ভাবে বস্তা স্থাপন করতে হবে যেন ১ টি থেকে অন্য টি ১ মিটার দূরত্বে অবস্থান করে। এরপর প্রতিটি সারিতে ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি পর পর দুইটি বস্তা স্থাপন করতে হবে।

বীজের আকার ও রোপন পদ্ধতিঃ বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময় ও বীজের আকার অনেক কার্যকরী। প্রতিটি বস্তায় ৪০ থেকে ৫০ গ্রামের একটি বীজ মাটির দুই থেকে তিন ইঞ্চি গভীরে লাগাতে হবে। এরপর মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।

আদার রোগ বালাই দমন

নিম্নে আদার রোগ বালাই দমন সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

কন্দ পঁচা রোগঃ বর্ষাকালে সাধারণত এই রোগ দেখা যায়। অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে গাছের নিচের দিকে পাতার প্রান্ত ভাগ হলুদাভাব দেখা দেয়। এর ফলে গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝিমিয়ে পড়ে। পচন সৃষ্টির ফলে কন্দ নরম হয়ে অভ্যন্তরীণ টিস্য সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়।

দমন পদ্ধতিঃ আদার উৎপাদন এবং অধিক ফলাফলের জন্য অবশ্যই সুস্থ ও রোগ জীবাণু মুক্ত বীজ নির্বাচন করতে হবে। আদার বীজ রিডোমিল গোল্ড/প্রোভেক্স ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে শোধন করে রোপন করতে হবে।

পোকামাকড় দমনঃ আগার গাছ বেড়ে ওঠার সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় আক্রমণ করতে থাকে। সেগুলো প্রতিরোধ করার জন্য অবশ্যই নিয়মিত স্প্রে করতে হবে।

দমন পদ্ধতিঃ পোকামাকড় দমনের জন্য ১০ থেকে ১৫ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার বিকেল বেলায় ০.৫% হারে মার্শাল প্রতি লিটার হারে ডাস্টবার্ন বা সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের ঔষধ স্প্রে করতে হবে।

আদা বীজ কোথায় পাবো

বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময় ও আদার বীজ উভয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আদা চাষে।কেননা বীজ ও উপযুক্ত সময়ে আদার ওপর না করতে পারলে এর উৎপাদন খুব একটা ভালো হয় না। আদা চাষ করে অধিক ফলন উৎপাদনের জন্য ও স্বাস্থ্যসম্মত বীজ এর কোন বিকল্প নেই। আদার বীজ আপনি বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করতে পারেন। স্থানীয় বাজার থেকে অথবা কৃষি অফিস অধিদপ্তর থেকেও পাওয়া যায়।
অনলাইন স্টোরঃ বর্তমানে সবকিছু অনলাইন নির্ভর হওয়ায় আপনি খুব সহজেই ঘরে বসে অনলাইন থেকে উন্নত মানের বীজ সংগ্রহ করতে পারেন। কৃষির বিভিন্ন সরঞ্জাম ও বীজের নির্ভরযোগ্য অনেক ওয়েবসাইট রয়েছে যেখান থেকে আপনি আদার বীজ সংগ্রহ করতে পারেন।


স্থানীয় কৃষকঃ স্থানীয় কৃষকদের থেকেও আপনি খুব ভালো মানের বীজ সংগ্রহ করতে পারেন। এতে করে নিজের গুণগতমান অক্ষুন্ন থাকে এবং কৃষকদের সঙ্গে ভালো একটা সম্পর্ক স্থাপন হয়।

আধা বীজের দাম

আদা বীজের দাম মূলত নির্ভর করে বীজের গুণগতমান এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদার উপর। তবে স্থান ও জায়গা ভেদে কমবেশি হতে পারে। সাধারণত আদা বীজের দাম প্রতি কেজি ৬০ থেকে ১০০ টাকা এবং উন্নত হাইব্রিড জাতের বীজের দাম কিছুটা বেশি প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

আদার অর্থনৈতিক গুরুত্ব

বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময় জানার পাশাপাশি চলুন জেনে নেই আদার অর্থনৈতিক গুরুত্ব। আধা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে বাংলাদেশে অধিক জনসংখ্যা হওয়ার ফলে কৃষি জমি কম থাকায় আদার তুলনামূলক কম হয়। তবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা থাকাই দিন দিন এর চাষ বাড়ছে।
আদা চাষের মাধ্যমে কৃষকগণ ও গৃহিণীরা নিজেরাই আত্মনির্ভরশীল হয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, চীন এবং ইউরোপের দেশগুলোতে এর প্রচুর পরিমাণে চাহিদা রয়েছে। সুতরাং আমাদের দেশে যদি উচ্চ গুন সম্পন্ন মানের আদা উৎপাদন করতে পারে তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ ভালো একটা আয় করার সম্ভাবনা রয়েছে।

আদার উপকারিতা

আবার একটি মসলাই নয়। এর রয়েছে বিভিন্ন ধরনের উপকারিতা। নিয়মিত আদা খেলে বিভিন্ন ধরনের রোগ প্রতিরোধ করা যায়। আদতে থাকা এন্টিবায়োটিক আমাদের মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়াতে অনেক সহায়তা করে। চল জেনে নেই আদার বিভিন্ন গুনাগুন ও উপকারিতা।

  • আদা ঠান্ডা, জ্বর, কাশি ও গলা ব্যথা উপশমে দারুণ কার্যকরী।
  • আদা ওজন কমাতে দ্রুত সহায়তা করে।
  • আদার রস বসন্ত রোগ নিরাময়েও কার্যকারী ভূমিকা রাখে।
  • আদার রস শরীর শীতল করে।
  • আদা হৃদপিন্ডের জন্য অনেক উপকারী। একখণ্ড আদা প্রতিদিন চিবিয়ে খেলে হৃদপিণ্ড ভালো থাকে।
  • কাশি এবং হাঁপানির জন্য আদার রসের সাথে মধু ও তুলসী পাতার রস মিশিয়ে খেতে পারেন। এটি অনেক কার্যকরী।

শেষ কথা

আদা শুধুমাত্র একটি মসলার নয়। রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গুনাগুন। আদা যেমন আমাদের খাবারের স্বাদ কে দ্বিগুণ বাড়িয়ে তুলে ঠিক তেমনি আদা আমাদের শরীরের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আশা করছি আমাদের এই আর্টিকেলটি পড়ার মাধ্যমে আপনি বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছেন।
আমাদের এই আর্টিকেলটি পড়ে বুঝতে কোথাও কোন সমস্যা হলে আর্টিকেলটি পুনরায় মনোযোগের সাথে পড়ুন। বস্তায় আদা চাষের উপযুক্ত সময় সম্পর্কে কোন প্রশ্ন বা মতামত থাকে তাহলে অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে জানাবেন। যদি আমাদের এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি উপকৃত হয়ে থাকেন তাহলে আপনি আপনার বন্ধুবান্ধবদের সাথে শেয়ার করুন, ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

চাঁপাই আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url