বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায়

টাইফয়েড জ্বর হলো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ যা সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়। যেকোনো বয়সেই টাইফয়েড হতে পারে, তবে শিশুদের ক্ষেত্রে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাটা বেশি থাকে। কেননা এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম থাকে। এই রোগ সাধারণত মৃদু থেকে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। অনেক সময় বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় মারাও যেতে পারে।
বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায়
তাই যত দ্রুত সম্ভব এর চিকিৎসা করতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে এর লক্ষণ গুলো প্রকাশ পায়। যদি আপনি আমাদের এই আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে পড়েন তাহলে বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায়, প্রতিরোধ, প্রতিকার, লক্ষণ ও করণীয় ইত্যাদি বিষয় গুলো বিস্তারিত জানতে পারবেন।
পেজ সূচিপত্রঃ বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায়

ভূমিকা

সালমোনেলা টাইফি নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট টাইফয়েড জ্বর একটি গুরুতর রোগ যা প্রাথমিকভাবে দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। টাইফয়েড জ্বরের প্রাথমিক লক্ষণ হল জ্বর। এছাড়াও অন্যান্য উপসর্গগুলো লক্ষ্য করে দ্রুত এর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এটা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে গুরুতর হলে মারাত্মক লেভেলের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
তাই আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করেছি বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায়, বাচ্চাদের টাইফয়েডের লক্ষণ, বাচ্চাদের টাইফয়েড হলে করণীয়, টাইফয়েড জ্বর ভালো হতে কতদিন লাগে ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

বাচ্চাদের টাইফয়েডের লক্ষণ

টাইফয়েড জ্বর হলো ব্যাকটেরিয়া জনিত একটা রোগ। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে টাইফয়েড খুবই সাধারণ একটা সমস্যা। বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা খুব দ্রুত এই রোগের শিকার হতে পারে। অতি দ্রুত এই রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা করা না হলে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সময় ছোট বাচ্চারা মারাও যাই। চলুন জেনে নেই বাচ্চাদের টাইফয়েডের লক্ষণ গুলি।

  • শরীরে টানা জ্বর থাকবে। জ্বর ১০৪ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে।
  • মাথা ও শরীর ব্যথা করবে।
  • শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিবে।
  • ক্ষুধামন্দা হবে।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়রিয়া দেখা দিবে।
  • বমি হবে।
  • প্রচন্ড রকমের কফ ও কাশি হবে।
  • পেটে ও পিঠে ব্যথা এবং পেটে দানা দিতে পারে।
  • তাপমাত্রার সাথে হৃদস্পন্দন কমতে পারে।

বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায়

সাধারণত রোগ জীবাণু শরীরে প্রবেশের ১ থেকে ২ সপ্তাহ পর টাইফয়েড এর লক্ষণ গুলো প্রকাশ পায়। লক্ষণগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর এটা আরো দ্রুত বাড়তে থাকে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এর চিকিৎসা করা দরকার। সাধারণত টাইফয়েড রোগের প্রধান লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। প্রথম পাঁচ থেকে ছয় দিন জ্বর কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে কিন্তু একদম ছেড়ে যাই না।

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার জন্য টাইফয়েডের লক্ষণ ও উপসর্গগুলো ভালোভাবে জেনে রাখা উচিত। পেশাদার চিকিৎসা ছাড়াও বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায় অনেক কার্যকরী। চলুন আর দেরি না করে জেনে নেই বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায় গুলি কি কি।

হাইড্রেশনঃ টাইফয়েড জ্বরের সময় হাইড্রেশন থাকা অত্যন্ত জরুরী। এ সময় প্রচুর পরিমাণে পানি ও ভেষজ পানি পান করতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণ হাইড্রেশন টক্সিন বের করে দিতে হবে এবং জ্বর ও ডায়রিয়ার কারণে হারানো পানি পূরণ করতে সহায়তা করে।

রসুনঃ রসুন তার প্রাকৃতিক এন্টিবায়োটিক এবং ইমিউন এর জন্য বিখ্যাত। সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে ও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

হলুদঃ হলুদ তার অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য এর জন্য পরিচিত। হলুদ আপনার দৈনিক খাবারের তালিকায় রাখুন এটি আপনার বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায় এ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আদা চাঃ আদা একটি শক্তিশালী এন্টি ইনফ্লামেটরি এবং হজমে সহায়ক। আদা পেটের অস্বস্তি ও বমি বমি ভাব দূর করতে এছাড়াও ডায়েটে আদা চা উত্তম কার্যকরী।
তুলসী পাতাঃ তুলসী পাতায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রয়েছে। তুলসী পাতা বাচ্চাদের টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়ক। আপনি তাজা তুলসী পাতা অথবা চা বানিয়েও খেতে পারেন।

মধুঃ সকল রোগের প্রতিষেধক বলা হয় মধুকে। বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায় অত্যন্ত কার্যকারী ভূমিকা রাখে। আপনার গলাকে প্রশমিত করতে ও বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে মধু হালকা গরম জলের সাথে অথবা লেবুর সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন।

পুদিনা পাতাঃ পুদিনা পাতা শীতল ও হজমের জন্য বিখ্যাত। এটি টাইফয়েড জ্বরের সাথে সাথে বমি বমি ভাব ও বমি কমাতেও সহায়তা করে। পুদিনা পাতা চিবিয়ে অথবা চাঁপানিও খেতে পারেন।

দারুচিনিঃ দারুচিনিতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি রয়েছে। আপনার প্রতিদিনের খাবারে এক টুকরো দারুচিনি রাখতে পারেন যা আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধে অনেক কার্যকরী।

কলাঃ কলাতে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম থাকায় জ্বর এবং ডায়রিয়া প্রতিরোধে অনেক সহায়ক ভূমিকা রাখে। কলা হজম শক্তি বাড়াতে ও পেট পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে।

বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাদ্যঃ টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত জরুরী। এছাড়াও টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে ব্যায়াম অত্যন্ত জরুরী। এর জন্য নিয়মিত ব্যায়াম ও ধ্যান করতে হবে। এছাড়াও নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার যেমন শর্করা আমিষ, খনিজ ও ভিটামিন জাতীয় খাদ্য রোগ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

বাচ্চাদের টাইফয়েড হলে করণীয়

ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তবে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে একটু বেশিই দেখা দেই। ইদানিং শিশুদের জ্বরের প্রকোপ বাড়ানোর ফলে অভিভাবকদের মধ্যে সেইটা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরমধ্যে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, ডেঙ্গু জ্বর, রক্ত আমাশয় ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

পানিবাহিত রোগ টাইফয়েড জ্বর সালমোনেলা টাইফি নামের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমিত হওয়ার ১০ থেকে ১৫ দিন পর জড়সহ এই রোগের লক্ষণ গুলো দেখা যায়। টাইফয়েড জ্বর প্রধানত ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে। পাশাপাশি বমি, পাতলা পায়খানা ও মাথা ব্যাথা হয়। এছাড়া পেট ব্যথা ও জিব্বার উপর সাদা দাগ দেখা যায়।
প্রথম ৭ দিন জ্বর অতিক্রম করার পর শিশুর চিকিৎসা না করালে নানা রকম ক্ষতিকর সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমনঃ খিচুনি, পেট ফুলে যাওয়া, রক্ত পায়খানা, জন্ডিস এমনকি মৃত্যুর পর্যন্ত হতে পারে। অন্যান্য সমস্যার ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, হাড়ের প্রদাহ, অস্থি সন্ধির প্রদাহ, স্নায়ুতন্ত্রের সংক্রমণ, ফ্রেন্ডের মাংসপেশিতে প্রদাহ ও কিডনির প্রদাহ দেখা দিতে পারে।

পরীক্ষাঃ জ্বরের প্রথম সপ্তাহে টাইফয়েড নির্ণয় করা বেশ কঠিন। তবে রক্ত ও প্রসব পায়খানার কালচার পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব।

কখন হাসপাতালে নেবেনঃ অতিরিক্ত মাত্রায় জ্বর, ঘন ঘন বমি, পেট ফুলে যাওয়া, পায়খানায় রক্ত যাওয়া, খিঁচুনি হওয়া ও অজ্ঞান হওয়ার মতো পরিস্থিতি হলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

চিকিৎসাঃ বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায় চিকিৎসা করা অত্যন্ত জরুরী। টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে পুষ্টিকরণ খাওয়া-দাওয়া ও বিশ্রাম অত্যন্ত জরুরী। টাইফয়েড জ্বর হলে প্যারাসিটামল সিরাপ বা ট্যাবলেট খাওয়াতে হবে। জ্বর কম হলে তিন থেকে পাঁচ দিন অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়াতে হবে। ভালো মানের এন্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করলে জ্বর ৫ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই উত্তম।

প্রতিরোধঃ টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা, নিরাপদ পানি ও খাবার গ্রহণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করা জরুরী। এছাড়া সরকার কর্তৃক যে বিভিন্ন ধরনের টিকা রয়েছে সেগুলো গ্রহণ করা। সবার জন্য টিকা ৩ বছর পর পর নেওয়া। টাইফয়েড জ্বর কোন ছোঁয়াচে নয়। সময় মত যথাযথ চিকিৎসা নিলে ১০০% ভালো হয়।

টাইফয়েড জ্বর ভালো হতে কতদিন লাগে

বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায় অবলম্বন করলে খুব সহজেই এর থেকে ভালো হওয়া যায়। টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসা ও প্রতিকার করে টাইফয়েডের জীবাণু পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শে জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল এবং ১০ থেকে ১৪ দিনের এন্টিবায়োটিক খেতে হয়। এন্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করলে সাধারণত ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই রোগী সেরে ওঠেন।
তবে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোন ঔষধ খাওয়া যাবে না এবং যতদিন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পরামর্শ দেবেন ততদিন খেতে হবে। এসময় শরীরের পানি শূন্যতা বেশি দেখা দেয় তাই রোগীর শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানির চাহিদা ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়াতে হবে। যদি জ্বর বেশি থাকে তবে শরীর বারবার মুছে দিতে হবে। তাহলেই খুব দ্রুতই টাইফয়েড জ্বর থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

শেষ কথা

টাইফয়েড জ্বর হলেই যে সব সময়ই হাসপাতালে যেতে হবে বা ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এমনটা জরুরি নয়। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু কিছু লক্ষণ দেখে চিহ্নিত করতে পারলে বাসায় বসে এর চিকিৎসা করা যায়। যেহেতু টাইফয়েড জ্বর একটি গুরুতর অসুস্থতা যার জন্য দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন। তাই এর লক্ষণ গুলো দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা নিতে হবে।
আশা করছি আমাদের এই আর্টিকেলটি পড়ার মাধ্যমে আপনি বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পেরেছেন। এছাড়াও বাচ্চাদের টাইফয়েড থেকে মুক্তির ঘরোয়া উপায় আরো জানতে চান তাহলে অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে জানাবেন।

আমাদের এই আর্টিকেলটি পড়ে বুঝতে কোথাও কোন সমস্যা হলে আর্টিকেলটি পুনরায় মনোযোগের সহিত পড়ুন। যদি আমাদের এই আর্টিকেলটি পড়ার মাধ্যমে আপনি উপকৃত হয়ে থাকেন তাহলে অবশ্যই আপনি আপনার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে শেয়ার করুন, ধন্যবাদ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

চাঁপাই আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url